রোহিঙ্গা সংকটের শুরু প্রায় অর্ধ শতাব্দী আগে। কিন্তু সম্প্রতি দুই পরাশক্তি আর আরেক পরাশক্তি হয়ে ওঠার খায়েশ আছে এমন শক্তির ত্রিমুখি টানাপোড়নে সংকট গভীর থেকে গভীরতর হয়েছে। সংকট শুরুর প্রাথমিক দায় রুশপন্থী লেফটদের। বাংলাদেশে এরা ভিজে বেড়াল সেজে থাকে, কিন্তু সারা পৃথিবীতে এরা যে কত অশান্তির আগুন জ্বালিয়ে রেখেছিল তার হিসাব নাই।
যাই হোক। মাত্র ১৯৩৭ সালের আগে পর্যন্ত বার্মা বৃটিশ-ইন্ডিয়া কলোনির এক প্রদেশ হিসাবে একসাথে শাসিত হয়েছে। ১৯৪৮ সালে বৃটিশদের কাছে থেকে স্বাধীনতা পাবার পরে থেকে মায়ানমার তেমন কোন বিদেশী বিনিয়োগের মুখ দেখেনি। বার্মা রাজনীতিতে আধুনিকতার যা কিছু দেখেছে তা ১৯৪৯ সালের স্বাধীনতার আগের কলোনি শাসকের কাছ থেকে যা দেখেছে শিখেছে ততটুকুই। তাই এই জনগোষ্ঠীর ভিতরে কোন পুজিবান্ধব মডার্ণ আউটলুক গড়ে ওঠেনি। স্বাধীনতা উত্তর ভাল বিনিয়োগের একটা অর্থনীতি বা ক্যাপিটাল ফর্মেশন গড়ে উঠে নাই বলে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ট্রাইবাল জাতিগত দ্বন্দ্ব সংঘাত গুলো বিরাট মাথাব্যাথা আর জাতীয় সমস্যা হয়ে উঠেছিল।

স্বাধীনতার ১৪ বছরের মাথায় ১৯৬২ সালে সোভিয়েত সমর্থিত সামরিক জান্তা নে উইন মায়ানমারের ক্ষমতা দখল করে। ক্ষমতা দখলের পরে “মায়ানমারিজম” নামে উগ্র ফ্যাসিস্ট জাতিয়াবাদের প্রবর্তন করে নে উইনের জান্তা সরকার। তারা সোভিয়েত সমর্থিত বামপন্থী হলেও অবাক বিষয় তাঁদের মায়ানমারিজমে তারা জাতিগত বিশুদ্ধতা এবং বৌদ্ধ ধর্মের আদর্শকে উর্ধে তুলে ধরার কর্মসুচি নেয় ঠিক হিটলারের জর্মানির মতো। এর প্রথম বলি হয় রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী যাদের রাষ্ট্র বার্মা হলেও তারা ঐতিহাসিকভাবে বর্মি নয় এবং ধর্মে মুসলমান। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের আগে পর্যন্ত মায়ানমার ছিলো সোভিয়েত বলয়েই। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন (১৯৯১ সালে) পর্যন্ত এই বলয়ের অধীনতা ছিলো মায়ানমারের। নিয়ম করে মায়ানমারে চলতো জনগণের গণতান্ত্রিক অভিপ্রায়কে দমন করা। ১৯৮৮ সালে মানবাধিকার প্রশ্নে আমেরিকার সাথে মায়ানমারের সম্পর্ক চরম আঁকার ধারণ করে। তারা ২৭ মে ১৯৯০ সালে প্রথম নির্বাচন দেয়। এ নির্বাচনে অং সান সু চি এর দল “ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসি” ৪৯২ টি অাসনের মধ্যে ৩৯২টি অাসন পায়।
ফলে দমননীতি চরমে উঠে। ১৯৯৭ সাল থেকেই মায়ানমারে যে সীমিত মার্কিন বিনিয়োগ ছিলো তা ফেরত আনতে শুরু করে। একারনেই সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পরেও আমেরিকার সাথে সম্পর্ক সহজ না হয়ে আরো জটিল হয়ে ওঠে এবং ঐ নির্বাচন বাতিলকে কেন্দ্র করে জাতিসংঘের অবরোধ স্থায়ীভাবে চেপে বসেছিল। সাথে অ্যামেরিকা মায়ানমারের উপরে অবরোধ আরোপ করে। এই সময়ে মায়ানমারে ঢুকে পরে চিন তার বিপুল বিনিয়োগ সম্ভার নিয়ে। ২০১৫-১৬ সাল থেকেই ভারত আমেরিকাকে বুঝাতে চেষ্টা করে
এই অঞ্চলে চিনের প্রভাব আমরা খর্ব করতে চাই কিন্তু এই একটা বিশাল দেশ যেখানে বিনিয়োগের অপুর্ব সুযোগ আছে সেখানে আমরা নাই, আর এই সুযোগে সেখানে ঢুকে গেছে চিন। আমরা তো আমাদের স্টেক হারাচ্ছি।
অ্যামেরিকা তো এদিকে অবরোধ দিয়ে রেখেছে সেটাকে তোলে কীভাবে? তাই মায়ানমারের সামরিক জান্তার সাথে নেগোশিয়েশন হয় যে তারা সুচিকে মুক্ত করে দেবে। সামরিক বাহিনী নাম কা ওয়াস্তে সুচিকে ক্ষমতায় আনবে। কিন্তু পিছন থেকে মুল ক্ষমতা আর্মির হাতেই আগের মত থাকবে। এবং সামরিক বাহিনীর ক্ষমতায় তার স্টেইক অক্ষুন্ন রেখেই মোটামুটি একটা গণতান্ত্রিক সরকারের মুখোশ পরে নেবে এবং অ্যামেরিকা তার অবরোধ উইথড্র করবে। তাই হলো, বার্মার সামরিক জান্তা এটা মেনে নিল এবং চিনের বিনিয়োগ যা হয়েছে এবং ভবিষ্যতে হবে সেটা অক্ষুন্ন থাকবে এই শর্তে চিন ও এই নতুন এরেঞ্জমেন্ট মেনে নেয়। ২০১৬ সালে মার্কিন অবরোধ তুলে নেয়া হয়। ভারতীয় এবং অ্যামেরিকান বিনিয়োগ মায়ানমারে আসতে থাকে। এই বিনিয়োগকারীদের জন্য দরকার হয় বিপুল পরিমাণ জমির। ফলে রোহিঙ্গাদের উপর অত্যাচারের একটা কারণ তাদের উচ্ছেদ করতে পারলে ঐ জমি নিতে পারবে। এই বছরেই ৩,১00,000 একর জমি রোহিঙ্গাদের জমি থেকে বিদেশীদের বিনিয়োগের এলাকা হিসেবে তুলে দেয়া হয়েছে।
সম্প্রতি এর মধ্যে একটা ঘটনা ঘটে যায়, আরাকানে চীন একটা গভীর সমুদ্র বন্দর তৈরি করার সিদ্ধান্ত নেয়। মাথায় বাজ পড়ে অ্যামেরিকা আর ভারতের। আমেরিকার অনেক আগে থেকেই একটা পরিকল্পনা ছিল যে আরাকান অংশটাকে মায়ানমার থেকে আলাদা করে নিয়ে সেখানে তার পছন্দের সরকার বসিয়ে অ্যামেরিকান স্বার্থের একটা ঘাটি করবে। অ্যামেরিকা এই খায়েশ নিয়ে এমনকি বাংলাদেশের সাথে কূটনৈতিক কথাবার্তা চালিয়েছিল বলে শোনা যায়। স্বাধীন আরাকান একটি অ্যামেরিকান প্রোজেক্ট এটা মাথায় রাখবেন। এবং আরাকানের স্বাধীনতাকামীরা রোহিঙ্গাদের মায়ানমারের শাসকদের চাইতে ভিন্ন চোখে দেখেনা এটাই মাথায় রাখবেন।
অ্যামেরিকা আর চিনের লড়াই তো গেল, তো এখন ছাগলের তিন নম্বর বাচ্চা ইণ্ডিয়া কী করবে? সেও তো চায় আরাকানে চিনাদের গভীর সমুদ্র বন্দর না হোক বা অন্তত এই বন্দর নির্মান দেরী হোক। ইণ্ডিয়ার হাতে আছে একটাই অস্ত্র আর তা হচ্ছে এই অঞ্চলে নাশকতা উস্কে দিয়ে পুরো এলাকা অশান্ত করে রাখা। রোহিঙ্গা কোপাইলেও বিজেপি আরাম পায়, রোহিঙ্গা পালাইলেও জমিটা পায় মুফতে, মায়ানমারও খুশি; তারা জাতিগতভাবে বিশুদ্ধ হতে পেরে, আর এই চান্সে আরাকানে চিনের বন্দরটা বানানো একটি দেরী হয়ে যায়। এটা অনুমান করা কষ্ট নয় যে ভারত এই রোহিঙ্গা বিতারনের পিছনে আছে। সেকারণেই বাংলাদেশের স্যেকুলার ও শাহরিয়ার কবিরেরা এমনকি পার্বত্য অঞ্চলের বিচ্ছিন্নতাবাদীরা কেন রোহিঙ্গা বিরোধী সেটার একটা ব্যখ্যা পাওয়া যায়। রসুনের খোসা আলাদা হলেও তার পাছাটা এক জায়গায়। খালি ওইটা যুক্তি মিলায়ে মিলায়ে খুঁজে দেখতে হবে। এইবার বলেন রসুনের পাছাটা কি খুঁজে পেলেন?
এখন আমাদের করণীয় কী? রোহিঙ্গাদের উপরে চালানো গনহত্যা থেকে পালিয়ে আসা কাউকে কি আমরা ঢূকতে দেবনা? দিলে কীভাবে দেব? আমার বক্তব্য হচ্ছে তাঁদের শরনার্থী হিসেবে ঢুকতে দেয়া হোক। কিন্তু মায়ানমারে তাদের স্বাধীনতা নাগরিকত্ব ও আরাকান ভুমিতে তাদের অধিকারের দাবিতে তারা লড়ে যাবে। অর্থাৎ অস্থায়ীভাবে আশ্রয় পেলে এরপর রাজনৈতিক লড়াইয়ে তাদের সক্রিয় ভুমি নিতে পারবে। শরনার্থী ক্যাম্পে পুরা রেশনের উপর যাতে তাদের না চলতে হয় সেজন্য তাঁদের সীমিত ওয়ার্ক পারমিট দেয়া যেতে পারে, নাগরিকত্ব নয়। তারা কাজ করবে, আর্ন করবে। আমাদের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য আলাদা লেইবার ফোর্স পাওয়াটা আমাদের দেশের জন্যই ভালো।
আর যারা কাজ করে খেতে পারবেনা, তাঁদের খাওানোর জন্য আমরা সারা পৃথিবীর কাছে সাহায্য চাইতে পারি। ওদের খাওয়াতে যা টাকাকড়ি লাগবে তার চাইতে বেশী সাহায্য আমরা পাবো, কম নয়। ১৯৭১ সালে ইন্ডিয়াও আমাদেরকে পুরাটা তাদের নিজের পকেটের পয়সায় খাওয়ায়নি আমাদের।